অ'ভিনয় করায় বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন বাবা

সবকিছু ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন বরেণ্য অ'ভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে বড় ছে'লের কবরের পাশে দিয়েছেন চিরঘুম। ৫ সন্তানের বিশাল পরিবারে প্রা'ণবিন্দুতে ছিলেন শামসুজ্জামান। সঙ্গে ছিল নাতি-নাতনিরাও।

আর এলাকার মানুষদের কাছেও তিনি ছিলেন চোখেরমণি।তাই সকালে সূত্রাপুর ম'সজিদে যখন মাইকে ঘোষণা করা হলো, প্রিয় অ'ভিনেতা আর নেই- চারদিকটা হয়ে গেল থমথমে। হাসিমুখে যে মানুষটা সেলফি, কৌতুকসহ নানা কিছুর আবদার পূরণ করে যেতেন, সেই মানুষটাই নেই!দীর্ঘ ছয় দশকের ক্যারিয়ারে অ'ভিনয়ের জো'রেই নিজের নামটিকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। তিনি ছিলেন একাধারে পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও গল্পকার। তার লেখা চিত্রনাট্যের সংখ্যা শতাধিক।

অ'ভিনয়ের জন্য আজীবন সম্মাননার পাশাপাশি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এটিএম শামসুজ্জামান ২০১৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।এটিএম শামসুজ্জামানের জন্ম ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে; বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকায় দেবেন্দ্রনাথ দাস লেইনে।বাবা নুরুজ্জামান ছিলেন নামকরা আইনজীবী। তিনি চাইতেন ছে'লেও তার মত আইন পেশায় আসুক। কিন্তু শেষে এটিএম শামসুজ্জামান চেয়েছিলেন লেখক হতে। সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্তকে লেখালেখিতে গুরু মানতেন, দৈনিক সংবাদে নিয়মিত তার লেখাও বের হত।

সেই শামসুজ্জামান অ'ভিনেতা হয়ে উঠলেন কী'ভাবে? দুই বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সেই শৈশব থেকেই মায়ের সঙ্গে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতে দেখতে হয়ে উঠেছিলেন সিনেমা'র পোকা। তখন থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি দুর্বলতা তৈরি হচ্ছিল। সেই তাড়না থেকেই হয়ত অ'ভিনয়ে আসা।অ'ভিনয় শুরুর পর বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন বাবা। শুরুর দিকে ছিলেন নাট'কের প্রমোটার। ২০ টাকা করে পেতেন। সূত্রাপুরের একটি হোটেলে তিন বেলা খেতেন। পরে সিনেমায় যখন নাম করলেন, সেই হোটেলওয়ালা তাকে বলেছিলেন, “আপনাকে দেখে আমা'র খুব ভালো লাগে। অনেক ক'ষ্ট করেছেন জীবনে।”

১৯৬১ সালে উদয়ন চৌধুরীর বিষকন্যা সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ মিলে যায়। পরে নারায়ণ ঘোষ মিতার জলছবি সিনেমা'র জন্য লেখেন চিত্রনাট্য। সেই সিনেমাতেই অ'ভিষেক ঘটে নায়ক ফারুকের।সিনেমা'র পর্দায় এটিএম শামসুজ্জামানের অ'ভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৫ সালের দিকে। শুরুর দিকে মূলত কমেডি চরিত্রেই তাকে দেখা যেত। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের নয়নমণিতে খল চরিত্রে অ'ভিনয় করে তিনি বোদ্ধাদের নজর কাড়েন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

লা'ঠিয়াল, অশিক্ষিত, গো'লাপী এখন ট্রেনে, পদ্মা মেঘনা যমুনা, স্বপ্নের নায়ক সিনেমা'র শামসুজ্জামান যেমন খল চরিত্রে ফ্রেমব'ন্দি হয়ে হয়েছেন, রামের সুমতি, ম্যাডাম ফুলি, যাদুর বাঁশি, চুড়িওয়ালায় তার কমেডি চরিত্রের কথাও মনে রেখেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শকরা।ওরা ১১ জন, স্লোগান, সংগ্রাম, সূর্য দীঘল বাড়ি, ছুটির ঘণ্টা, রামের সুমতি, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, পদ্মা মেঘনা যমুনা এবং গেরিলার মত সিনেমাতেও এটিএম শামসুজ্জামান অ'ভিনয় করেছেন নানা ভূমিকায়।

অ'ভিনয়ের জন্য এটিএম শামসুজ্জামানের প্রথম পুরস্কার ছিল বাচসা'স পুরস্কার। পরে ১৯৮৭ সালে কাজী হায়াতের দায়ী কে সিনেমা'র জন্য শ্রেষ্ঠ অ'ভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।এরপর ১৯৯৯ সালের ম্যাডাম ফুলি, ২০০১ সালের চুড়িওয়ালা, ২০০৯ সালের মন বসে না পড়ার টেবিলে সিনেমায় অ'ভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ কৌতুক অ'ভিনেতা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।

২০১২ সালের চো'রাবালি সিনেমা'র জন্য পান পার্শ্বচরিত্রে শ্রেষ্ঠ অ'ভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। আর ২০১৭ সালে ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।২০১৫ সালে পান একুশে পদক। চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে ও পরে টেলিভিশনেও বহু নাট'কে দেখা গেছে তাকে। ভবের হাট, রঙের মানুষ, ঘর কুটুম, বউ চু'রি ও শতবর্ষে দাদাজান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

Back to top button

You cannot copy content of this page