বাংলাদেশিদের জন্য কি সংকুচিত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার লো'ভনীয় শ্রমবাজার

অ'তি অল্প সময়ে আর্থিক দিক দিয়ে শীর্ষ অবস্থানে যাওয়া এবং শক্তিমত্তা ও সাহসী পদক্ষেপের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্ববাসীর নজরে। অন্যান্য দেশের মতো কোরিয়ার প্রতি নজর রয়েছে বাংলাদেশেরও। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ‘দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী নেওয়া হবে’ এমন শিরোনামে পত্রিকায় প্রায়শই বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। এই কর্মী নেওয়ার বিজ্ঞাপনটি সবসময়ই বাংলাদেশি তরুণদের কাছে এক নব প্রেরণার আলো ও অর্থনৈতিক মুক্তির আশা।

বাংলাদেশে কর্মহীন, বেকার ও শিক্ষিত অনেক তরুণের স্বপ্নের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। শত ক'ষ্ট ও অসীম ধৈর্য ধরে ইপিএস সিস্টেমে কোরিয়ায় যেতে পারলে ভাগ্য বদলাবে, জীবনের মোড় ঘুরবে, ঘুচবে বেকারত্ব এবং আসবে পরিবারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এমনই মনে করে বাংলাদেশের তরুণরা। কিন্তু দিনদিন বাংলাদেশিদের জন্য কাজের সুযোগ কমছে দক্ষিণ কুরিয়ায়।

কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মা'র্কেট। অথচ সময়ের পরিক্রমায় বাজারটি সংকোচনের চেইনে আ'ট'কে আছে। কুয়েত, সৌদি আরব, জর্ডান, দুবাই ও ই'রাকের মতো ক্ষীণ হয়ে আসছে লো'ভনীয় এই শ্রমবাজার। সম্ভাবনাময় এই শ্রমবাজার থেকে গতবছরেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আহ'রণে ১২তম দেশ।

দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ১৩ হ্যজার বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন ঠিকই কিন্তু নানা কারণে আবার শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে। কিন্তু সব ছাপিয়ে বর্তমানে কূটনৈতিক দৌঁড়ঝাপ বেড়েছে।

স্বল্প খরচে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর সরকারিভাবে কয়েক হাজার কর্মী দক্ষিণ কোরিয়ায় যান কাজ করতে। এখানে বাংলাদেশি কর্মীরা বেতন পান ১ লাখ বিশ হাজার থেকে দুই লাখ পর্যন্ত। আগের মতো স্রোত না থাকলেও শ্লথ গতিতে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া অব্যাহত রয়েছে কোরিয়ায়। অনেকের মতে, এই শ্রমবাজার দিন দিন ক্ষীণ হচ্ছে।

অ'তীতে বাংলাদেশের চারটি জনশক্তি রপ্তানি কোম্পানির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী নিয়োগ হলেও ২০০০ সালে সেটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ওভা'রসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের (এইচআরডি) মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। পয়েন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হয়। অর্থাৎ আবেদনকারীর কোরিয়ান ভাষা, কর্ম'দক্ষতা, শারীরিক যোগ্যতা, বৃত্তিমূলক কাজের যোগ্যতা, প্রযু'ক্তির প্রশিক্ষণ ও চাকরির অ'ভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয় মূল্যায়নের ভিত্তিতে পয়েন্ট পান। সেসব পয়েন্টের ভিত্তিতে প্রথম'দফা প্রার্থী বাছাই করা হয়।

এরপর কোরিয়ার কর্মক'র্তাদের তত্ত্বাবধানে ইন্টারনেট ভিত্তিক দক্ষতা পরীক্ষার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফার কর্মী বাছাই হয়। দুই রাউন্ড মিলিয়ে সর্বাধিক নম্বর পাওয়া ব্যক্তিদের চূড়ান্ত করা হয়। পরীক্ষা, যাচাই বাছাইয়ের পরে কর্মীদের এই তালিকা দেওয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। সেখান থেকে তারা তাদের চাহিদা মতো কর্মী বেছে নেন। বাছাইকৃত কর্মীদের মেয়াদ থাকে দুই বছর। এর মধ্যে কোরিয়ান কোম্পানি তাদের বেছে না নিলে পুনরায় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়।

বাছাই হওয়ার পর বিমান ভাড়া, বোয়েসেলের ফিসহ সবমিলিয়ে একজন কর্মীর খরচ হয় ৮০ হাজার টাকা। বোয়েসেলের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে ২০১২ জন কর্মী দক্ষিণ কোরিয়ায় গেছেন। কিন্তু করো'নাকালে এবছর বাংলাদেশ থেকে কর্মী এসেছে হাতেগোনা। বরং যারা দেশে আ'ট'কা পড়েছেন তারা আদৌ আসতে পারবেন কিনা অনেকে স'ন্দেহ করছেন। অনেকেই রি এন্ট্রি কর্মীদের ফিরে আসা নিয়ে উৎকন্ঠা প্রকাশ করছেন।

বাংলাদেশি বেশ কয়েকজন কর্মীর অ'পেশাদারিত্ব আচরণের কারণে কোরিয়ান মালিকদের কাছে বাংলাদেশিদের চাহিদা কমতির দিকে। এটি অবশ্যই অশনি সংকেত। সত্য ঘটনা অবলম্বনে তিনটি কেস স্টাডি এখানে উল্লেখ করা হলো-

এক. কোরিয়ার ইনছনে একটি ফার্ণিচার কোম্পানিতে কাজ করেন ১৪ জন বাংলাদেশি শ্রমিক। সেখানে বাংলাদেশিদের সুনামের সাথে কাজ করার রেকর্ড রয়েছে। বলা চলে সব বাংলাদেশি ভাইদের মাঝে সুন্দর ও প্রা'ণখোলা স'ম্পর্ক ছিল।একই সাথে কোম্পানির মালিকও বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের দক্ষতায় মুগ্ধ। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় কিছুদিন পর।সেখানে মাহমুদ নামের একজন ছে'লে নিয়োগ পেয়ে কাজ শুরু করেন। কিছুদিন পর দেখা গেল সে কোরিয়ান ভাষা ভালো জানায় নিজ দেশি ভাইদের বি'রুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কাছে বি'কৃত তথ্য উপস্থাপন করে। পাশাপাশি নতুন যারা কোম্পানিতে যোগদান করে তাদেরকে মানসিকভাবে টর্চার শুরু করে। বাংলাদেশি কর্মী ভাইটির টর্চারে ও মানসিক যন্ত্র'ণায় অনেকে কোম্পানিটি থেকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়। এভাবেই কোম্পানিটিতে বাংলাদেশিদের ইমেজ ক্ষুন্ন হয় এবং ধীরে ধীরে কোম্পানিটিতে বাংলাদেশিদের প্রভাব কমতে থাকে।

দুই. ঘটনাটি গিম্পু শহরে। সালেহ নামের একজন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করতে যায় একটি কেমিক্যাল কোম্পানিতে। তিনি ই৭৪ ভিসা করার জন্য ৭ বছর কোম্পানিটিতে কাজ করার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ই ৭৪ ভিসা পরিবর্তন করার পরে সে চার মাস পরে রিলিজ নিয়ে অন্যত্র চলে যায়। এতে মালিক ক্ষিপ্ত হয়ে অন্য একজন বাংলাদেশি ই৯ ভিসাধারীকে জো'রপূর্বক রিলিজ দিয়ে দেন। কোরিয়ান মালিকটি শপথ করেন আর কোনও বাংলাদেশি কর্মী তিনি তার কোম্পানিতে নিবেন না। ।

তিন. উজুংবুতে রহিম নামের একজন বাংলাদেশি কর্মী কাজ করতেন টেক্সটাইল কোম্পানিতে। তিনি ভাষা শিক্ষা অর্জন করায় একই সাথে মালিক তাকে এফ ২৬ ভিসা পরিবর্তনে সহায়তা হিসেবে প্রতিমাসে বাড়তি বেতন দেখাতেন। ভিসা পরিবর্তন হওয়ার রহিম বেতন কম পান বলে মালিকের সাথে ইচ্ছে করে ঝগড়া লাগিয়ে কোম্পানি পরিবর্তন করেন। কিছুদিন পর ঐ কোম্পানিটি ধীরে ধীরে ই৯ ভিসা ধারী অন্যদেরকে নানা প্রক্রিয়ায় রিলিজ প্রদান করে।

এছাড়া, ২০১৭ সালে দেশটিতে বসবাসরত দেড় হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী সেজে রাজনৈতিক আশ্রয় চায়। হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যককর্মী রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হওয়ায় দেশটির কর্তৃপক্ষ বিস্ময় প্রকাশ করে। রাজনৈতিক আশ্রয়ের মূল কারণ তুলে ধরেছে, দেশে তাদের নামে একাধিক রাজনৈতিক মা'মলা রয়েছে। দেশে ফিরলেই পু'লিশ তাদের আ'ট'ক করবে। মা'মলার সপক্ষে তারা বিভিন্ন কাগজপত্রও জমা দেয়। যারা রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে তাদের বেশিরভাগেরই চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে ছিল। তারা যাতে কোরিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকতে পারে- তার জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় চায় তারা। দেশ থেকে এক শ্রেণীর দালাল নানা ধরনের ভু'য়া কাগজপত্র তৈরি করে তাদের কাছে পাঠায়। হঠাৎ করে অনেকেই রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীরা ইমেজ সংকটে পড়ে।

এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (ইপিএস) স্কিমের আওতায় নির্ধারিত সময়ে কাজের কন্ট্রাক্টে দেশটিতে স্থায়ীভাবে থাকার কোনও সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরে না এলে দেশটি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগই বন্ধ করে দিতে পারে।

একসময় বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম দিকে থাকলেও এখন তাদের হটিয়ে নেপাল, ভিয়েতনাম, মিয়ানমা'রের কর্মীরা জায়গা দখল করে নিয়েছে।

বাংলাদেশিদের চাহিদা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণগু'লির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অল্প সময়ের মধ্যে ঘনঘন চাকরি পরিবর্তন করেন। এর ফলে অনেক নিয়োগদাতারা বিরাগভাজন হন। এছাড়া অনেক কর্মীর মালিকদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, খাবারের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা এবং সার্টিফিকেট জালিয়াতি।

কোরিয়ার শ্রমবাজারকে চাঙা রাখতে হলে ইমেজ বৃদ্ধির দ্বিতীয় কোনও বিকল্প নেই। একই সাথে কোরিয়ান সরকার, কোরিয়ান জনগণ ও কোরিয়ার কোম্পানি মালিকদের কাছে বিশ্বস্থতা অর্জন করতে হবে। চলবে…

জুমবাংলানিউজ/এইচএম

Back to top button

You cannot copy content of this page